Wednesday, December 31, 2008

একটি তিক্ত অভিজ্ঞতা ও অনৈতিকতামুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন

প্ল্যু সা শাঁজ প্ল্যু সে লা মেম্ শোজ। মুজতবা আলী ভ্রমনপ্রিয় পন্ডিত ব্যক্তি। বহু ভাষায় তার দক্ষতা ছিল। তার কোন এক বইতেই এই ফরাসী প্রবাদটি পড়েছিলাম। তিনি এর যে ইংরেজী অনুবাদ দিয়েছিলেন তা হচ্ছে, “The more it changes the more it is the same thing.” অর্থা কিনা যতই তুমি কোন কিছু পরিবর্তন কর ততই এটা একই জিনিস রয়ে যায়। আশা করি ফরাসী প্রেসিডেন্ট মহোদয় ওবামাকে তাদের এই প্রবাদটির কথা জানাননি, তাহলে চেঞ্জ-এর ধ্বজাধারী ওবামা কিছুটা বিব্রত বোধ করতেন কিনা বলা মুশকিল। যাইহোক প্রবাদটির সত্যাসত্য বিচারে কখনও মাথা ঘামাইনি। কিন্তু প্রবাদটি যে সত্য হলেও হতে পারে সেটি হাড়ে হাড়ে টের পেলাম পাসপোর্ট বানাতে গিয়ে। পাসপোর্ট অফিসে যদি কেউ আজ থেকে কয়েক বছর আগে গিয়ে থাকেন এবং তখনকার অবস্থার সাথে বর্তমান অবস্থার তুলনা করেন তাহলে বুঝতে পারবেন সেখানকার অবস্থার যথেষ্ট পরিবর্তন বা চেঞ্জ ঘটেছে। পাসপোর্ট অফিসের গেট পর্যন্ত পৌছাবার আগে অসংখ্য দালাল আপনাকে তাদের নানান অফার নিয়ে ছেকে ধরবেনা। একসময় মোড় থেকে শুরু করে পাসপোর্ট অফিস পর্যন্ত আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অসংখ্য ফটোকাপির দোকান ছিল, যারা কিনা পাসপোর্টের ফর্ম ফটোকপি করে বিক্রি করত। সেসব দোকানও এখন নেই। বাইরে মোটামুটি একটি ছিমছাম পরিবেশ। এখানে বলে রাখা ভাল পাসপোর্ট ফরম এখন বাংলাদেশ সরকারের ওয়েবসাইটেও পাওয়া যাচ্ছে। সুতরাং ফর্ম নিতে আর পাসপোর্ট অফিস পর্যন্ত যেতে হবেনা। এটি একটি ইতিবাচক পরিবর্তন বলতে হবে। অফিসের ভেতরকার পরিবেশও বাইরের মতই কম বেশী ভালই মনে হল। আপাতদৃষ্টিতে দালালদের চোখে পড়লনা। সবচেয়ে চেঞ্জ চোখে পড়ল তাদের সার্ভিসে। ছয় হাজার টাকায় জরুরী পাসপোর্ট নেয়া যায় এবং ভোটার আইডি কার্ড থাকলে সেটা এক ঘন্টার মধ্যেই হাতে পাওয়া যায়। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি আগে জরুরী পাসপোর্টের ক্ষেত্রেও নানা ঝামেলা পোহাতে হত। একটি জরুরী পাসপোর্ট করতেই গিয়েছিলাম, দিনে দিনে পাসপোর্ট হাতে পেয়ে ভাবছিলাম যাক শেষ পর্যন্ত তাও কিছু পরিবর্তন এসেছে। খোদ আমেরিকাতেই যখন পরিবর্তনের সুবাতাস, আর আমাদের দেশেও যখন দুবছর ব্যাপি নানা আবর্তন আর প্রবর্তনের ঢেউ, তখন বিবর্তনের নানা ধারা পেরিয়ে পাসপোর্ট অফিসের এই পরিবর্তন বেশ আবশ্যম্ভাবী বলেই মনে হচ্ছিল।

পাসপোর্ট হাতে পাওয়ার সাতদিনের মধ্যে পুলিশ ভেরিফিকেশন হয়। এ সময়ের মধ্যে যে এস, আই মহোদয় ভেরিফিকেশনে এসেছিলেন তিনি আমাকে বাসায় খুজে পাননি। তাকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়েছে বাসার লোকজন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যেমন বিদ্যুত বিলের ফটোকপি ইত্যাদি দেয়া হয়েছে। কিন্তু এসএসসির সার্টিফিকেট প্রয়োজন ছিল। আমার সার্টিফিকেট কোথায় আছে বাসার কেউ জানতেননা। তাই তিনি তার ফোন নম্বর দিয়ে গিয়েছিলেন এবং বাসায় বলে রেখেছিলেন আমি যেন তার সাথে সার্টিফিকেট সহ দেখা করি। যথারীতি আমি তার মোবাইলে ফোন করলাম পরের দিন। তিনি আমাকে রাতে যেতে বললেন মিরপুর চৌদ্দ নম্বর পুলিশ কোয়ার্টারে। ক্লাস শেষ করে রাত নয়টার সময় কোন মতে মিরপুর দশ নম্বর নেমে একটা রিকশা নিলাম চৌদ্দ নম্বরের উদ্দেশে। রিকশায় উঠে যাচ্ছিলাম। এমন সময় মনে পড়ল প্রচলিত নর্ম (?) অনুযায়ী যিনি পুলিশ ভেরিফিকেশন করেন কষ্ট করে, তার কিছু দাবী দাওয়া থাকে। খেয়াল করে দেখলাম আমার কাছে বাসায় যাওয়ার ভাড়া ছাড়া আর কিছুই নেই। গতকাল লোকটা যেহেতু এসেছিল বাসায় সুতরাং বাসায় ফোন করলাম বিষয়টা পরিষ্কার হবার জন্য। জানতে পারলাম আমাদের বাসার কেয়ারটেকারের মাধ্যমে তাকে একশত টাকা দিতে চাওয়া হয়েছিল। লোকটি তা নিতে রাজী হননি। শুনে আমি যারপরনাই খুশি হলাম। যাক শেষ পর্যন্ত তাহলে সব জায়গায় কিছু চেঞ্জ এসেছে। লোকটি তাহলে সত্যিই সৎ। এই ভেবে আমি ফুরফুরে মন নিয়ে উক্ত সৎ এস আই পানে চলতে থাকলাম। চৌদ্দ নম্বর পুলিশ কোয়ার্টারের গেটে এসে তাকে ফোন করলাম। তখন বাজে রাত সাড়ে নয়টা। তিনি জানালেন সারা দিনের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম শেষে তিনি একটু খেতে বসেছেন। তিনি আমাকে পুলিশ কোয়ার্টারের গেটে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বললেন। আমি গেটের কাছে দাড়াতে গেটম্যান আমাকে এখানে আসার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। আমি কারণ বলতেই সে আর কিছু বল্ল না। আমি কিছুক্ষণ চুপচাপ দাড়িয়ে থাকলাম। গেটম্যান কনস্টেবলটি আমাকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে গার্ডরুমের ভেতর থেকে একটি চেয়ার বের করে আমাকে বসতে দিল। কছুক্ষণ বসে থাকতে হল। এরই মধ্যে হঠাৎ দেখতে পেলাম এক লোক এদিকে এগিয়ে আসছে। রাস্তা বেশ অন্ধকার থাকায় লোকটি তার মোবাইলের টর্চটি জ্বালিয়ে রেখেছে। লোকটি কাছে এসে যখন নিশ্চিত হল যে আমিই তার কাছে এসেছি তখন সে মোবাইলের লাইটের ইশারা করে তার সাথে যেতে ইংগিত করল। আমি একটু ধাক্কার মত খেলাম, কারণ পুলিশ কোয়ার্টারটি গাছপালা ঘেরা একটি বড় এলাকা জুড়ে রয়েছে। সেখানে শুধু এই গেটের কাছেই যা একটু উজ্জ্বল আলো রয়েছে। রাস্তার পাশে ল্যাম্পপোস্টের খুবই অপ্রতুল আলো, তাছাড়া আশে পাশে সব ঘন অন্ধকার। এই অবস্থায় লোকটি কোথায় নিয়ে যেতে চাচ্ছে? যাইহোক অনিচ্ছাসত্ত্বেও অনুসরণ করতে হল। লোকটি যেখানে নিয়ে গেল তা গেট থেকে বেশ দূরে। মাঠের পাশে কয়েকটি পুলিশের পুরাতন ভাঙ্গা গাড়ি পড়ে রয়েছে, আশে পাশে অন্ধকার, কেমন ভৌতিক পরিবেশ। আমার মনে কেমন যেন খটকা লাগতে শুরু করল, কারণ গার্ডরুমের সামনে একটা টেবিলও ছিল আবার প্রয়োজনীয় আলোও ছিল। সে জায়গা বাদ দিয়ে এখানে কেমনতর কাগজ পত্রের এসেসমেন্ট হবে তা আমার মাথায় ঢুকলনা। যাইহোক মনের চিন্তা মনে চেপে রেখে লোকটির রুটিন জাতীয় প্রশ্নের উত্তর দিতে থাকলাম। সে অনেকটা যন্ত্রের মত অভ্যস্ত গলায় প্রশ্ন করতে থাকল, আপনি অমুক? এটা আপনার ছবি? এটা আপনার সাইন ইত্যাদি। সে অবশ্য এক্ষেত্রে তার মোবাইল সেটের টর্চটি ব্যবহার করছিল। ছবির সাথে চেহারা মেলাতে সে আমার চেহারার উপরও আলো ফেলল। এসএসসি সার্টিফিকেট নেয়ার পর সমস্ত ফর্মাল প্রশ্ন শেষে, লোকটি বেশ খাতির জমানো আলাপ আলোচনা শুরু করল। যেমন আপনি কোথায় পড়েন, অনার্স কি বিষয়ে করেছেন ইত্যাদি ইত্যাদি। সে এক পর্যায়ে জানাল সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছে অনেক আগে। এসব কথার ফাঁকে আমার মনে চেপে রাখা শংকাবোধটা কমে গেল, আমি তার সাথে সহজভাবে কথা বলতে থাকলাম। এক সময় দেখা গেল কথার প্রসঙ্গসমূহ শেষ হয়ে যেতে লাগল এবং এক সময় লোকটি চুপ হয়ে গেল এবং আমার মনে হতে থাকল লোকটি আমাকে কিছু বলতে চাচ্ছে। যাইহোক শেষ পর্যন্ত লোকটা সম্ভবত লজ্জা ভেঙ্গে মনের কথাটি পেড়েই ফেল্ল। লোকটি অস্পষ্টভাবে কি বল্ল তার শব্দ সব আমি বুঝতে পারলামনা। তারপরও এতটুকু স্পষ্টভাবে বুঝলাম লোকটি টাকা চাচ্ছে। আমি যারপর নাই আঘাতপ্রাপ্ত হলাম। অবস্থাটি স্বাভাবিক ভাবেই বিব্রতকর মনে হল। একদিকে তো টাকা নাই আবার মানুষ কিভাবে এত নির্লজ্জ হতে পারে তা ভেবে এসব পরিস্থিতিতে আমি নিজেই লজ্জায় নুয়ে পড়ি। আমি লোকটিকে জিজ্ঞেস করলাম গতকাল যে তাকে টাকা দিতে চাওয়া হয়েছিল, তা সে নিলনা কেন? লোকটি বলল - "ও! ঐটা! দারোয়ান আমাকে একশ টাকা সাধছিল, কিন্তু একশ টাকা দিয়া কি হইব, একশ টাকা তো আমার মটর সাইকেল স্টার্ট দিতেই ফুরায়া যায়।" এবার বিষয়টি পরিষ্কার হল। লোকটি কতটা সৎ এবং আমাদের লোকদের ক্যারেকটারের মধ্যে কতটুকু পরিবর্তন এসেছে তা ঠিক ঠিক বেঝা গেল। প্ল্যু সা শাঁজ প্ল্যু সে লা মেম্ শোজ প্রবাদটি যতই দূর দেশী হোক না কেন প্রবাদের মধ্যে যে সত্যতার ব্যাপার স্যাপার থাকতে পারে তা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারলাম।

যাইহোক আমি লোকটিকে কোনমতে কনভিন্স করলাম যে আমার কাছে সত্যিই কোন টাকা পয়সা নাই। কিন্তু লোকটি যেন ঠিক সন্তুষ্ট হতে পারছেনা এবং নানাভাবে তা সে প্রকাশ করছে। এ অবস্থা চলতে চলতে হঠাৎ আলো আধারীর মধ্যেই দেখতে পেলাম লোকটির চোখের তারা নেচে উঠল, যেন সে নতুন একটা সল্যিউশন খুজে পেয়েছে। সে ভ্রু নাচিয়ে বলে উঠল, “আরে ভাই আজকাল কি আর এসবে কোন সমস্যা আছে নাকি, আপনি বাসায় যেয়ে আমার নাম্বারে একটা ফেক্সি পাঠায়া দিলেই তো হল। আমার নম্বার তো আপনার কাছে আছেই! ”এই অভিনব আইডিয়ার কথা শুনে কিছুণের জন্য বাকশূন্য হয়ে গেলাম। ফিরতী রিকশায় করে যখন আসছিলাম তখন মনটা খুবই খারাপ লাগছিল। লোকটি যেমন সৎ ধারণা করে গিয়েছিলাম ঠিক তেমনই বিপরীত ধারণা নিয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে। মানুষ এত নিচে কিভাবে নামতে পারে বিনা দ্বিধায়! তারা কি বিবেকের এতটুকু দংশনও অনুভব করেনা!

মনে পড়ল, টি আই বি বলেছিল যে এ সরকারের আমলে দুর্নীতি বেড়েছে। অথচ এই দুর্নীতি দূর করার জন্যই দেশে কতনা হৈ হৈ কান্ড ঘটে গেল গত দুবছর ধরে। ন্যাশনাল হাউজহোল্ড সার্ভে ২০০৭ এর সূত্র ধরে ট্রান্সপারেন্সি জানায়: “In terms of magnitude law enforcing agencies including joint forces, police, Rapid Action Battalion (RAB) were found to be the most corrupt...” অর্থাৎ মাত্রার দিক থেকে জয়েন্ট ফোর্স, পুলিশ, র‌্যব সহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে দুর্নীতির মাত্রা সবচেয়ে বেশী। সার্ভেতে আরও জানা গেছে ৯৬.৬ শতাংশ লোক আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাথে ইন্টার‌্যাক্ট করতে যেয়ে কোন না কোন দুর্ভোগের স্বীকার হয়েছে। তার মধ্যে ৯৪ শতাংশ দুর্ভোগের স্বীকার হয়েছে পুলিশের কাছ থেকে বাকিটুকু জয়েন্ট ফোর্স বা র‌্যাবের কাছ থেকে। টি আই বি চেয়ারম্যান ১৮ই জুন ২০০৮ তারিখে তথ্য দেন, পাবলিক এবং প্রাইভেট সেক্টর মিলে মোট ঘুষ গ্রহনের পরিমাণ হচ্ছে ৫৪৪৩ কোটি টাকা। টি আই বি এর রিপোর্টগুলো নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ থাকতে পারে। এগুলো কতটুকু গ্রহনযোগ্য হচ্ছে বা হয়েছে আর এগুলো কি উদ্দেশ্যেই বা করা হয়েছে বা হচেছ সে সম্পর্কে নানা প্রশ্ন ওঠাটা খুবই যৌক্তিক বলে মনে হয়। কিন্তু এ তথ্যগুলো যদি আমরা ততটা আমলে নাও নিই, তারপরও বলা যায় এ সরকারের দুর্নীতি বিরোধী ড্রাইভের কারণে দুর্নীতির উপর তেমন কোন প্রভাব পড়েছে বলে মনে হয় না। অন্তত এতটুকু তো নিরাপদে বলাই যায় অনেক কিছু পরিবর্তন করার পরও দুর্নীতি আমাদের জন্য এখনও একটি বড় সমস্যা - এ সত্যটির কোন পরিবর্তন হয়নি। আসলে দুর্নীতির বিষয়ে কোন ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা যেমন নেতিবাচকভাবে এবং হাস্যকর উপায়ে করা হয়েছে তা সত্যিই নিন্দা করার মত। রোড শো এর মত হালকা প্রদর্শনমূলক কর্মকান্ডের মাধ্যমে তো অন্তত দুর্নীতির মত গভীর, জটীল এবং সিরিয়াস ধরণের সমস্যা দূর করা যাবে না। এটুকু অন্তত আমাদের বোঝা উচিৎ। দুর্নীতির সাথে একজন মানুষের মূল্যবোধ, তার বিশ্বাস, জীবনধারা সমস্ত কিছু জড়িত। দুর্নীতি কেন এবং আমাদের এ অবস্থা থেকে বের হবার জন্য কি কি করা যেতে পারে তা একটি দীর্ঘ ও গভীর চিন্তা-গবেষণার বিষয়। কিন্তু যদি মোটা দাগে বলতে চাই তাহলে বলতে হয় এর একটি প্রধান কারণ হচেছ বৈষয়িকতা। আমরা আমাদের বৈষয়িক প্রয়োজনগুলোকে অনেক বাড়িয়ে নিয়েছি। ছোটবেলায় গ্রামবাংলার সহজ সরল যে চিত্রটি আমাদের মনে বইয়ের পাতা থেকে গেথে গিয়েছিল সেই চিত্রটি গ্রামে বা শহরে কোথাও-ই খুঁজে পাওয়া যাবেনা। সবখানেই মানুষ জীবনকে অতিরিক্ত প্রতিযোগীতামূলক, জটীল এবং অতিমাত্রায় বস্তুবাদী করে ফেলেছে। আমাদের জীবন দৃষ্টির পরিবর্তন না ঘটলে, লোভ না কমাতে পারলে কিভাবে এ অবস্থার পরিবর্তন হবে তা বলা মুশকিল।

এক্ষেত্রে নৈতিকতা একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। মানুষের নৈতিকতা মানুষের জীবন-দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ করে। আর নৈতিকতা না থাকলে লোভের কাছে আমাদের হার মানতেই হবে। নৈতিকতা যদি না থাকে তাহলে, সুযোগ পেলে একজন মানুষের অধিক কিছু অর্জন থেকে নিজেকে বিরত রাখবার আসলে কোন যুক্তিযুক্ত কারণ নেই। এস আই সাহেবরা যদি মানুষের ঘরে ঘরে পুলিশ কিয়ারেন্স দিতে গিয়ে কিছু বার্তি টাকা পান তাহলে তিনি নেবেননা কোন যু্ক্তিতে? এস আই সাহেবের কাছ থেকে কথা প্রসঙ্গে জানতে পেরেছিলাম তিনি প্রতিদিন প্রায় ৪০ টি বাসায় যান। এর মধ্যে ৩০ টি বাসা থেকেও যদি তিনি গড়ে ২০০ টাকা করে পান তাহলে তার দৈনিক আয় হচেছ ৬০০০ টাকা। এভাবে তিনি যদি ২৫ দিন ডিউটি করেন তাহলে তার আয় হচেছ ১,৫০,০০০ টাকা। এত টাকা মাসিক বেতন তো ঢাকা শহরে বড় বড় অফিসাররাও পাননা। তাহলে তিনি কেন এ সুযোগটি ব্যবহার করবেননা? আসলে নৈতিকতা, শুধুমাত্র নৈতিক বোধ মানুষকে এমন কাজ থেকে দূরে রাখতে পারে।

আমাদের এ দেশটি সাইত্রিশ বছরে পা দিল। একটি জাতিরাষ্ট্রের বিচারে এটি কোন বড় সময় নয়। এখনও আমাদের পাড়ি দিতে হবে অনেক পথ। আর তাই এখনও স্বপ্ন দেখতে চাই অনৈতিকতা মুক্ত সুন্দর একটি বাংলাদেশের। এ-কি খুবই অন্যায় আর অসম্ভব স্বপ্ন? সবাই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলে সর্বব্যাপী অনৈতিকতার হাত থেকে দেশকে মুক্ত করা কি খুবই কঠিন? বিজয়ের এ মাসে বিজয়ের আনন্দের পাশাপাশি আমরা সকলে কি একটি অনৈতিকতা মুক্ত সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ গড়ার প্রতিজ্ঞা নিতে পারিনা?

Monday, December 08, 2008

ত্যাগেই খুশি

দুম্বা কিম্বা গরু খাশি
চলছে জবাই রাশি রাশি।
কোথায় হাসি কোথায় খুশি?
ত্যাগের একোন্ বাজছে বাশি?
ভোগের মোহে সুখ বিলাসী
বুঝবেনা এর কম বা বেশী।
ত্যাগেই খুশি ত্যাগেই হাসি
জানুক সকল বিশ্ববাসী।

Wednesday, November 26, 2008

“স্বপ্ন এত ছোট কেনে?”

কথায় বলে, ছালায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন। মানে খুব বেশী স্বাপ্নিক হলে সমস্যা। এটি যেমন একটি সমস্যা তেমনি খুব ছোট স্বপ্ন হলেও সমস্যা। স্বপ্ন খুব ছোট হলে যে সমস্যা হয় তা হল, বড় স্বপ্ন পূরণের দিকে যাওয়ার অনুপ্রেরণা থাকেনা। এটি খুবই পরিষ্কার হবে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের দিকে তাকালে। ছোট খাট সাফল্যে দল ও দর্শক এমন খুশিতে ফেটে পড়ে যে ধারাবাহিক ভাবে ভাল করা এবং আরো ভাল পারফর্ম করার দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। অতি আবেগের নেতিবাচক প্রভাব যে সত্যিই রয়েছে তার প্রমাণ খোদ বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক আশরাফুলের কথা থেকে পাওয়া গেছে। একদিন তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল কেন তিনি ধারাবাহিক ভাবে ভাল করতে পারেননা। তার উত্তর ছিল অনেকটা এরকম: আসলে একদিন ভাল করার পর আমি এত বেশী খুশি হয়ে যাই যে তার প্রভাবে পরবর্তী অনেকদিন ভাল করতে পারিনা।

আসলেই আমরা জাতিগত ভাবেই খুবই আবেগ প্রবণ। আর আবেগ প্রবণ হবার কারণে আমরা খুব অল্পেই অতিশয় আবেগে উদ্বেলিত হয়ে পড়ি। আর এ বিষয়টিই প্রথম আলোতে আনিসুল হক তার ‌ ‘স্বপ্ন এত ছোট কেনে?’ শিরোণামের গদ্যকার্টুনে তুলে ধরেছেন। তিনি সশস্ত্র বাহিনী দিবসে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার সংক্ষিপ্ত কুশল বিনিময়ের ব্যপারে মিডিয়ার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে লিখেছেন। আসলেই খালেদা ও হাসিনার কয়েক মিনিটের আলাপ মিডিয়া যে ভাবে হাইলাইট করল তা আমাকেও কিছুটা কৌতুকদ্দীপ্ত করে তুলেছিল। আনিসুল হক লিখেছেন, “সশস্ত্র বাহিনী দিবসে বেগম খালেদা জিয়া আর শেখ হাসিনা পাশাপাশি দাড়িয়েছিলেন। তাদের মুখে হাসি ছিল। তারা কুশল বিনিময় করেছেন। শেখ হাসিনা নাকি জানতে চেয়েছেন, বিশেষ কারাগারে যখন পাশাপাশি থাকতেন তারা, তখন বেগম জিয়ার জন্য তিনি খাবার রেধে পাঠিয়েছিলেন, সেটা বেগম জিয়া পেয়েছেন কি না! এরকমই কথা বার্তা। কিন্তু সেটাই হয়ে উঠল আমাদের টেলিভিশন ও খবরের কাগজগুলোর প্রধান খবর। একটার শিরোনাম ছিল, জাতির স্বপ্নপূরণ।” আসলে এ রকম শিরোনাম কি একটু বাড়াবাড়ি নয়? অবশ্যই দু নেত্রীর কথা বলাকে, হাত মেলানোকে আমরা স্বাগত জানাব। বরং সরল দৃষ্টিতে তো মনে হচেছ কথা বলা, হাত মেলানো খুবই স্বাভাবিক। আর সে জন্যই একে এমনভাবে হাইলাইট করায় আমি নিতান্ত অবাক হতে হয়েছে। আমরা তো আশা করি দু নেত্রী শুধু কথা বলবেননা তারা দুজনের প্রতি সহনশীলতা প্রদর্শন করবেন। তাদের মতদ্বৈতা যেন জাতিকে দুভাগ করে না ফেলে, জাতিকে সংঘাতের মুখে ঠেলে না দেয় সেদিকে খেয়াল রাখবেন। অথচ অতীতে আমরা এমনটিই হতে দেখেছি বার বার। কিন্তু দুজনেই সাবেক প্রধান মন্ত্রী ছিলেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, কোন দলের নয়। তাই আমাদের বিশ্বাস দু'জনেই এ দেশের ভালই চান। আর তাই জাতীয় স্বার্থে একাট্টা হয়ে কাজ করতে হবে তাদের। নতুবা জাতি দুর্বল থেকে দুর্বলতর হতেই থাকবে। তাই বলছিলাম আমাদের স্বপ্ন তো অনেক বড়। দু’জনে দু’মিনিট কথা বলাটা অবশ্যই ভাল হয়েছে। তবে আমাদের স্বপ্ন এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ রাখতে চাই না। আমরা আরো বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ স্বপ্নপূরণের জন্য অপেক্ষা করছি। সেজন্য তাদের অতি স্বাভাবিক সৌজন্যমূলক কুশল বিনিময়কে আমরা খুশির সাথেই নিতে চাই কিন্তু আহলাদে আটখানা হতে চাই না। আমরা দেখতে চাই রাজনীতিতেও তাদের এই সৌজন্য বজায় থাকবে।

Wednesday, November 19, 2008

আয়েশা (রা:)-এর বিবাহের বয়স প্রসংঙ্গে

আয়েশা (রা:)-এর বিবাহের বয়স প্রসংঙ্গে
ইন্টারেনটে কিছু গ্রুপ আছে যারা অন্ধ নাস্তিক। তারা ইসলামের বিরুদ্ধে বিষেদগার ছড়াতে ব্যস্ত। তবে ইসলাম বিদ্বেষীদের একটি সমস্যা হচ্ছে তাদের পকেটে মাত্র পাচ-সাতটি অভিযোগের কয়েন আছে, এগুলোই তারা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ছুড়ে মারছে বারবার। এরকমই একটি অভিযোগ হচ্ছে আয়েশা (রা:)-কে রাসুল (সা:) শিশু বয়সে বিয়ে করেছেন সুতরাং তিনি শিশুদের প্রতি যৌণ আকৃষ্ট ছিলেন, ইংরেজীতে যাকে বলে পেডাফাইল (নাউযুবিল্লাহ)। যে কোন নিরপেক্ষ বিচারে এ অভিযোগ ডাহা মিথ্যা এবং ইসলামের বিরুদ্ধে চলমান প্রচারণার উগ্র বহি:প্রকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়।
বিশিষ্ট স্কলার আদিল সালাহি এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাব দেন, যেটি প্রকাশিত হয় আরব নিউজে ৭ মার্চ ২০০৩ তারিখে। তিনি বলেন
"এ প্রশ্নটি ইসলাম এবং রাসুল (সা:)-এর ব্যক্তি চরিত্রের প্রতি আক্রমণ বৃদ্ধির সংগে সংগে বার বার উঠে আসছে। কিন্তু ইসলাম অথবা রাসুল (সা:)-এর চরিত্র এবং ব্যবহারে এমন কিছু নাই যার জন্য আমাদের ক্ষমা চাওয়ার বা বিব্রত বোধ করার প্রয়োজন আছে। তারপরও রাসুল (সা:)-এর সাথে আয়েশা (রা.)-এর বিয়ে এবং সে সময় তার বয়স প্রসংঙ্গে কিছু আলোচনা করা যেতে পারে যাতে প্রমাণ হয় এব্যপারে আদৌ অভিযোগ করার মত কিছুই নাই। এ ব্যপারে যে বর্ণনাটি সবচেয়ে বেশী উদ্ধৃত হয় তা হচেছ, রাসুল (সা:) যখন বিয়ের প্রস্তাব দেন তখন আয়েশা (রা:)-এর বয়স ছিল ছয় এবং তিনি যখন তাকে বিয়ে করেন তখন তার বয়স ছিল নয়। মানুষ এটাকে প্রতিষ্ঠিত সত্য বলে গ্রহন করে থাকে। কিন্তু যখন আমরা এসব বর্ণনা এবং তার সাথে সংশ্লিষ্ট সমস্ত বিষয়গুলো পরীক্ষা নিরীক্ষা করি, তখন আমরা দেখতে পাই, এসব বর্ণনা এমনকি প্রাথমিক নিরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হতে পারেনা।
সর্বপ্রথম আমাদের যে বিষয়টি বুঝতে হবে তা হচ্ছে, রাসুল (সা:)-এর সময় আরব সমাজের অধিকাংশই ছিল নিরক্ষর এবং খুব কম লোকই লিখতে বা পড়তে পারত। বড় বড় ঘটনাগুলোর সন তারিখ হিসেব রাখার জন্য যেখানে কোন নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার ব্যবহার করা হত না, সেখানে মানুষের জন্ম মৃত্যুর তারিখ হিসেব রাখার কথাতো বাদই দেয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আমরা পড়ি - রাসূল (সা:) জন্মগ্রহন করেছেন ‘হাতির বছরে’। হাতির বছর বলতে বোঝায় সেই বছর যেবার আবিসিনিয়ার সেনাপতি ইয়েমেন থেকে মক্কা এসেছিল এক বিরাট সেনাবাহিনী নিয়ে কাবা ঘর ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে। একটি বড় হাতি সৈন্য বাহিনীর সামনে মার্চ করে আসছিল - আর তাই ঘটনাটি এবং বছরটি হাতির নামে পরিচিত হয়।
রাসূল (সা:)-এর সময় আরবে মানুষের বয়স সংক্রান্ত বর্ণনাগুলো বিভ্রান্তিকর এবং অনির্দিষ্ট ছিল। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সাধারণ ধারণা হচ্ছে, খাদিজা (রা:)-এর সাথে রাসূল (সা:)-এর বিয়ের সময় রাসুল (সা:)-এর বয়স ছিল ২৫ অন্যদিকে খাদিজা (রা:)-এর বয়স ছিল ৪০। ইবনে হিশাম রচিত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সিরাত গ্রন্থে এরকম উল্লেখ থাকলেও সে সময় রাসুল (সা:)-এর বয়স সম্পর্কে আরো দু’টি ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে খাদিজা (রা:)-এর সাথে বিয়ের সময় রাসূল (সা:)-এর বয়স ছিল ৩০, অন্যটিতে বলা হয়েছে ২৯। সে সময় খাদিজা (রা:) বয়স কত ছিল সে সম্পর্কেও বর্ণনার বিভিন্নতা আছে - কোথাও বলা হয়েছে সে সময় তার বয়স ছিল ৩৫ কোথাও বলা হয়েছে ২৫। রাসূল (সা:)-এর সাহাবীদের মধ্যে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্যদের একজন ছিলেন রাসূল (সা:)-এর চাচাতো ভাই ইবনে আব্বাস (রা:)। তার থেকে একটি বর্ণনা পাওয়া যায়, যেখানে তিনি বলেছেন, বিয়ের সময় রাসূল (সা:) ও তার স্ত্রী উভয়ের বয়সই ছিল ২৮ বছর। খাদিজা (রা:)-এর গর্ভে রাসূল (সা:)-এর ছয়টি সন্তান জন্মগ্রহন করেছে। এদিক থেকে বিচার করলে বিয়ের সময় তার বয়স চল্লিশ ছিল এমন ধারণা করার উপায় নেই, অথচ এটাই হচ্ছে সবচেয়ে প্রচলিত বর্ণনা। প্রকৃতপক্ষে তার বয়স এর চেয়ে অনেক কম হবার কথা। তার বয়স ২৮ অথবা ২৫ ছিল এমন বর্ণনাই অনেক বেশী যুক্তিসঙ্গত মনে করা যেতে পারে।
খাদিজা (রা:)-এর জীবদ্দশায় রাসূল (সা:) আর কাউকে বিয়ে করেননি এবং তিনি খাদিজার (রা:) সাথে ২৫ বছর কাটিয়েছেন। তার ইন্তেকালের পর যখন তিনি খুবই চাপের মুখে ছিলেন, তখন একজন মহিলা সাহাবী তাকে পরামর্শ দিয়ে বল্লেন, তার বিয়ে করা উচিৎ যাতে তিনি দিনের দীর্ঘ প্রচারকাজ শেষে বাড়িতে একজন সঙ্গিনী পান এবং স্বস্তি লাভ করতে পারেন। সেই মহিলা তাকে দু’জনের কথা বল্লেন, একজন কুমারী আয়েশা অন্যজন বিধবা সাওদা। রাসূল (সা:) তাকে দুজনের কাছেই প্রস্তাব নিয়ে যেতে বল্লেন।
রাসূল (সা:)-কে নতুন বিয়ে করার প্রস্তাব দেয়ার উদ্দেশ্য ছিল তার জন্য একজন সঙ্গীনি এবং স্বস্তির ব্যবস্থা করা। কিন্তু যারা বলতে চান যে আয়েশা (রা:)-এর বয়স সে সময় ছয় ছিল তারা এটা বিশ্বাস করতে বলেন যে ঐ মহিলা সাহাবীটি রাসূল (সা:)-কে মাত্র ছয় বছরের একটি বালিকার সাথে বিয়ের তথা সঙ্গ লাভের প্রস্তাব করেছিলেন। আর বয়স সংক্রান্ত ঐসব বর্ণনা যদি গ্রহন করা হয় তাহলে সন্দেহ জাগা স্বাভাবিক যে, ঐ মহিলা সাহাবীটি কি তাহলে রাসূল (সা:)-কে সঙ্গ দেয়ার কথা বলছিলেন নাকি সঙ্গ দেয়া কথা বলছিলেন তার মেয়েকে, যার বয়স তখন ছয় বছরের চেয়ে বেশী ছিল ?
বর্ণনাগুলো শুধু যৌক্তিকতার আলোকে বিচার না করে একে কিছু দালিলীক ভিত্তি প্রমাণ স্বাপেক্ষে বিবেচনা করা উচিৎ। এজন্য আমরা ইবনে ইসহাক রচিত সিরাত গ্রন্থ দেখব। আর ইবনে ইসহাক রচিত সিরাত গ্রন্থ হচেছ সমস্ত সিরাত গ্রন্থগুলোর ভিত্তি এবং সবচেয়ে নির্ভুল। সেখানে সেসব মুসলিমদের একটি তালিকা আছে, যারা ইসলামী দাওয়াতের শুরুর বছরগুলোতে ইসলাম গ্রহন করেছিলেন। সেই তালিকাটিতে প্রায় পঞ্চাশ জন মুসলিমের নাম আছে। যার মধ্যে আবু বকরের দুই কন্যা আসমা এবং আয়েশার নামও অন্তর্ভুক্ত আছে। সেখানে এটাও যোগ করা আছে যে তিনি সে সময় ছোট ছিলেন। এই তালিকায় আয়েশার নাম এসেছে বিশ নম্বরে। কিন্তু আমরা এই ক্রমের উপর তেমন গুরুত্ব আরোপ করবনা। আমরা যে বিষয়টির উপর গুরুত্ব দেব তা হচ্ছে, এই তালিকার সমস্ত মুসলিমই ইসলাম গ্রহন করেছিলেন নবুয়্যতের পঞ্চম বছরের আগে। কেননা ঐ বছরই আবিসিনিয়ায় মুসলমানদের প্রথম হিজরত সংঘঠিত হয় এবং ঐ তালিকায় এমন অনেকের নাম ছিল যারা এই হিজরতে অংশগ্রহন করেছিলেন। তাই বলা যায় পঞ্চম বছরে বা তার পূর্বে আয়েশা (রা:) ছোট ছিলেন, কিন্তু নিশ্চয় ততটা বড় ছিলেন যাতে তার নাম একটি নতুন দাওয়াতে বিশ্বাস স্থাপনকারীদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। তার বয়স কত ধরে নিতে পারি আমরা ? নিশ্চয় মনে করা ঠিক হবে না যে তার বয়স ২ অথবা ৪ অথবা ৫ ছিল আর তারপরও তাকে কীর্তিমানদের নামের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তাই যদি হত তাহলে তালিকার পঞ্চাশজনের অন্যান্য সকলেরই যত বাচ্চা কাচ্চা ছিল সকলেরই নাম সেখানে অন্তর্ভুক্ত করা হত। আসলে তিনি নিশ্চয় এতটা বড় ছিলেন যাতে তাকে ধর্ম পরিবর্তন করা বা নতুন ধর্ম গ্রহন করা - এই মাত্রার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলে উল্লেখ করা যায়। এই হিসেবে লোকে যদি তাকে অনেক ছোট বলার প্রতি গুরুত্বারোপ করতে চায়, তাহলেও তার বয়স ১০ অথবা ৮ এর কম হবার কথা না।
এখন আমাদের দেখতে হবে এর কত বছর পর তার বিয়ে হয়েছিল। আমরা জানি তার বিয়ে হয়েছিল রাসূল (সা:) এবং সাহবীদের মদিনায় স্থায়ী হবার পর, অর্থাৎ, নবুয়্যতের ১৩ কিংবা ১৪ তম বছরে। সাধারণ অংক কষলে দেখা যাবে যখন রাসূল (সা:)-এর সম্ভাব্য স্ত্রী হিসেবে তার নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল তখন তার বয়স ১৪-এর কম হতে পারেনা বা অন্যভাবে বলা যায় রাসূল (সা:)-এর সাথে বিয়ের সময় তার বয়স ১৭-এর কম হতে পারেনা। এমনকি প্রবল সম্ভাবনা আছে যে তার বয়স আসলে আরও বেশী ছিল, সম্ভবত ১৯।
এখন কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে রাসূল (সা:) ৫৩ অথবা ৫৪ বছর বয়সে ১৭ বা ১৯ বছরের এক তরুণীকে বিয়ে করলেন কেন ? এটা বুঝতে হলে আমাদের একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে যে আমরা সামাজিক রীতি নীতিকে অপর একটি ভিন্ন সমাজের জন্য প্রযোজ্য করতে পারিনা - এমনকি যদি দু’টি সমাজ একই সময়েরও হয়। তাই আমেরিকার সামাজিক রীতি নীতি আফ্রিকা, মালয়েশিয়া বা জাপানে প্রযোজ্য নয়। আবার এদের কোন দেশেরটিই অন্য আর একটি দেশের জন্য প্রযোজ্য নয়। সেসময়ের আরবের লোকেরা একজন লোক ও তার স্ত্রীর মধ্যে বয়সের পার্থক্যের তেমন কোন গুরুত্ব আছে বলে মনে করতনা। এখানে উমর ইবনে খাত্তাব (রা:) ও তার মেয়ে হাফসার কথা তুলে ধরা যেতে পারে। যখন তার মেয়ের তালাক হয়ে গেল তখন উমর (রা:) আবু বকর (রা:)-কে তার মেয়ের সাথে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন, যেখানে উমর (রা:) নিজেই আবু বকরের (রা:) চেয়ে ১০ বছরের ছোট ছিল। যদি বিয়েটি হত তাহলে স্বামী স্ত্রীর বয়সের পার্থক্য ত্রিশের কম হতনা। তারপরও উমর ভাবছিলেন এটি একটি চমৎকার এবং প্রীতিকর জুটি হতে পারে। যখন আবু বকর এ প্রস্তাবের জবাব দিতে দেরী করছিলেন তখন তিনি উসমানকে (রা:) প্রস্তাব দেন, যে উমরের (রা:) চেয়ে মাত্র কয়েক বছরের ছোট ছিল। কিন্তু উসমানের (রা:) বিয়ে না করার একটি কারণ ছিল, ফলে শেষে রাসূল (সা:)-এর সাথে উমরের কন্যা হাফসার বিয়ে হল। রাসূল (সা:) আবু বকরের সমবয়সী বা তার কিছূটা বড় ছিলেন। আসল কথা হল তখন বয়সের পার্থক্যকে গণনায় ধরা হত না।"
একজন বড় স্কলার এবং বর্তমান কালে লিখিত অন্যতম ও বিশাল সিরাত গ্রন্থের প্রণেতা হিসেবে আদিল সালাহির কথা অবশ্যই বিবেচনার দাবী রাখে। তদুপরি তিনি যে যুক্তিগুলো উপস্থাপন করেছেন তা খুবই শক্তিশালী। অনেক সময় আমাদের মধ্যে দুর্বল ধারণাগুলো প্রচলন পায় বেশী। আশা করি আদিল সালাহির লেখাটি আমাদের ধারণাকে পূনুর্বিন্যস্ত করতে সহায়তা করবে এবং বিপথগামী কিছু লোকের মনগড়া অভিযোগের পথ বন্ধ করবে। যদিও তারা তাদের মুখ বন্ধ করবে কিনা জানা নেই। কারণ মিথ্যা অভিযোগকারীরা সাধারণত যুক্তি দিয়ে পরিচালিত হয়না। তারা যুক্তি দিয়ে পরিচালিত হোক এটুকুই আমরা কামনা করতে পারি মাত্র।